পদ্মার ঢেউয়ে লেখা জীবনলিপি: চরাঞ্চলের মানুষের অন্তহীন জীবন সংগ্রাম
ছবি- সকালের বার্তা
পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চল যেন এক ভিন্ন জগৎ। এখানে মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় অনিশ্চয়তা আর নদীভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে। নদী জমি কেড়ে নেয়, আবার নতুন চর জেগে ওঠে—এই নিষ্ঠুর চক্রের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ি ও মাদবরের চরের কয়েক হাজার মানুষের জীবন। দারিদ্র্য, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এসব মানুষের জন্য নাগরিক সুবিধা পাওয়া এখনো এক অপূর্ণ স্বপ্ন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ভাঙনকবলিত এসব মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ও মাছ ধরা। কিন্তু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল এই জীবিকা মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড করে দেয় আকস্মিক ভাঙন কিংবা খরা। বর্ষা মৌসুমে চরাঞ্চল জুড়ে নামে আতঙ্কের ছায়া। পানির তোড়ে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেলে তারা যাযাবরের মতো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ান।
যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা চরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রধান সংকট। পাকা রাস্তার অভাবে নৌকা ছাড়া চলাচলের বিকল্প নেই। বর্ষায় উত্তাল নদী পাড়ি দেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জরুরি চিকিৎসায় কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে ছোটখাটো রোগও এখানে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা আউয়াল মিয়া বলেন, “নৌকা ছাড়া আমাদের চরের মানুষের আর কোনো গতির নাই। সময়মতো হাসপাতালে যাইতে পারি না বইলা আমাদের অনেক কষ্ট সইতে হয়।”
একই চিত্র শিক্ষা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ অঞ্চলের বিশাল জনপদ। যাতায়াত সমস্যার কারণে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার পর আর এগোতে পারে না। কলেজছাত্রী রাবেয়া আক্তারের মতে, উপজেলা সদরে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করা চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এক দুঃসাধ্য লড়াই।
কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের আবুল চৌকিদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “প্রতি বছর নদী আমাগো ঘরবাড়ি খায়, আমরা আবার নতুন কইরা বাঁধি। আমাগো এই কষ্টের কথা কেউ দেখে না। উন্নয়নের ছোঁয়া এইখানে কবে আসবে জানি না।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিচ্ছিন্ন এই জনপদকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে চরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
জনপ্রতিনিধিরা জানান, চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে, তবে ভৌগোলিক কারণে সেবা পৌঁছে দেওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরাঞ্চলের এই সংগ্রামী মানুষের ভাগ্যবদল করতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে আসাই এখন বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত।
পদ্মার এই চরাঞ্চল যেন বাংলাদেশের এক সংগ্রামী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে টিকে থাকা মানেই প্রতিদিন একটি নতুন যুদ্ধে জয়লাভ করা।
















