২২ দিনের কর্মহীনতা শেষে মেঘনা তেঁতুলিয়া নদীতে জেলেরা, ইলিশের অপেক্ষায় হাজারো পরিবার
টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে। জাল, নৌকা আর বুকভরা আশা নিয়ে নদীতে নেমেছেন উপজেলার প্রায় ৪০-৫০ হাজার জেলে। দীর্ঘ কর্মহীনতা, ধারদেনা ও আর্থিক সংকট কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। এখন তাঁদের একটাই প্রত্যাশা নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে, বিক্রির টাকায় শোধ হবে পুরোনো দেনা, আর সংসারে ফিরবে স্বস্তি।
মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে টানা ২২ দিন মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় কর্মহীন সময় পার করতে হয়েছে জেলেদের। আয়-রোজগার বন্ধ থাকলেও থেমে থাকেনি সংসারের খরচ। নৌকা ও জালের রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার কেনা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক জেলেকেই ধারদেনা করতে হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টায় নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন জেলেরা। কেউ নৌকা মেরামত করেছেন, কেউ জাল গুছিয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভাব-অনটন কাটিয়ে ওঠার আশায় নতুন উদ্যমে যাত্রা করেছেন নদীর বুকে। তবে তাঁদের এই প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তাও। নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত হওয়ার ওপর নির্ভর করছে তাঁদের আগামী দিনের আর্থিক স্বস্তি।
ধারদেনায় জর্জরিত জেলেদের চোখে নতুন স্বপ্ন
ভোলার নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন তাঁদের অনেকেরই কেটেছে চরম আর্থিক সংকটে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে তাঁদের অব্যাহতি মেলেনি। বাধ্য হয়ে অনেকে পরিচিতজন ও মহাজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে সংসার চালিয়েছেন।
জেলে মোসলেউদ্দিন বলেন, “২২ দিন মাছ ধরতে না পেরে খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছি। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন নদীতে নেমেছি, আশা করছি ভালো মাছ পাব। ইলিশ বেশি ধরা পড়লে দেনা শোধ করে পরিবারের খরচ চালাতে পারব।”
জেলে অনিক চন্দ্র বলেন, “আমাদের জীবিকা নদীর মাছের ওপর নির্ভরশীল। নিষেধাজ্ঞার সময় আয় বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছি। এখন অনেক আশা নিয়ে নদীতে নেমেছি। আমরা চাই, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাক এবং মাছের ন্যায্য দাম নিশ্চিত হোক।”
নিষেধাজ্ঞা মানলেও ক্ষতির শঙ্কায় জেলেরা
নিষেধাজ্ঞার সুফল নিয়ে আশাবাদী হলেও কিছু জেলের মনে রয়েছে উদ্বেগ। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কিছু অসাধু জেলে গোপনে ইলিশ শিকার করেছেন। এতে আইন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাঁদের মতে, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি।
জেলে নুরে আলম বলেন, “আমরা সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কিছু লোক মাছ ধরেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে আমরা যারা আইন মেনে চলেছি, তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হই। নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ থাকলে আমাদের কষ্ট কিছুটা কমবে।”
ইলিশ সংরক্ষণে সচেতনতার আহ্বান মৎস্য বিভাগের
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করা এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ৮ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টায় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হওয়ায় জেলেরা পুনরায় নদীতে মাছ ধরার সুযোগ পেয়েছেন।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, “ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ কাজ করেছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় জেলেরা আবার মাছ ধরতে পারবেন। ইলিশ সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। এতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং জেলেরা দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন।”
নদীতে ইলিশের প্রাচুর্যই ফেরাতে পারে জেলেদের মুখের হাসি
মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার বুকে এখন জেলেদের ব্যস্ততা, আর তাঁদের চোখেমুখে নতুন দিনের প্রত্যাশা। দীর্ঘ ২২ দিনের কর্মহীনতা ও আর্থিক সংকট পেছনে ফেলে তাঁরা স্বপ্ন দেখছেন ভালো মাছ পাওয়ার। তবে সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা, মাছের বাজারদর এবং নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশের ওপর।
জেলেদের প্রত্যাশা, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়লে তাঁরা পুরোনো দেনা শোধ করার পাশাপাশি পরিবারের নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে পারবেন। ফিরবে সংসারে স্বস্তি, কমবে অভাব-অনটন, আর নতুন করে আশার আলো দেখবে নদীনির্ভর হাজারো পরিবার।
এখন তাই ভোলার জেলেদের দৃষ্টি নদীর দিকে। তাঁদের কাছে প্রতিটি জালভর্তি ইলিশ মানে শুধু মাছ নয়, বরং ঋণের বোঝা কমানোর স্বপ্ন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশা এবং নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা।


















