লালনের গানে সম্প্রীতির সুর, ছেঁউড়িয়ায় সাধু-ভক্তদের মিলনমেলা আজ দ্বিতীয় দিন চলছে উৎসব।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় যেন সুরের মূর্ছনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন। একতারা-দোতারার সুর, মরমি গানের আবেশ আর সাধু-ভক্তদের মিলনধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে লালন আখড়াবাড়ি। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনে রোববার (১৮ অক্টোবর) হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবস্থলে তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাউল, সাধক ও ভক্তদের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও এসেছেন লালনপ্রেমীরা। কারও কণ্ঠে সাঁইজির গান, কারও সাধুসঙ্গে অংশগ্রহণ, আবার কেউ এসেছেন লালনের দর্শন সম্পর্কে জানতে। সব মিলিয়ে ছেঁউড়িয়া পরিণত হয়েছে লোকজ সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবিক চেতনার এক মিলনক্ষেত্রে।
আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই ছিল ভক্ত-অনুরাগীদের আনাগোনা। একতারা, দোতারা ও ঢোলের তালে বাউলশিল্পীদের পরিবেশনায় শোনা যায় লালন সাঁইয়ের মরমি সংগীত। এসব গানের কথায় উঠে আসে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সমাজ, মানবপ্রেম, আত্মোপলব্ধি এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। দুপুরে বিশেষ খিলাফত গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ‘পূর্ণসেবা’। লালন অনুসারীদের ঐতিহ্যবাহী এসব আচার-অনুষ্ঠান স্মরণোৎসবের আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আরও গভীর করে তোলে।
স্মরণোৎসবের অংশ হিসেবে আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান। প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুল্লাহ হারুন। গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, ৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়ার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি (পিএসসি), কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দিন এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ।
আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. শেখ খালিদ হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন কুমারখালী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার।
বক্তারা লালনের মানবধর্ম, জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয় এবং বর্তমান সমাজে তাঁর দর্শনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় গুরুত্ব পায় মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়গুলো।
আলোচনা সভা শেষে মূল মঞ্চে শুরু হয় লালনগীতি ও মরমি সংগীতের আয়োজন। লালন একাডেমি এবং দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় রাতভর চলে গানের আসর। এতে অংশ নেন টুনটুন বাউল, সুনীল কর্মকার, রওশন ফকির ও লতিফ শাহসহ বিশিষ্ট বাউলশিল্পীরা।
এদিকে, মূল মঞ্চের বাইরে কালী নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে গ্রামীণ তৈজসপত্র, একতারা, ডুগডুগিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, লালনবিষয়ক বই এবং লোকশিল্পের নানা উপকরণ। মেলা ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা, অনেকে সংগ্রহ করছেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মারক।
স্মরণোৎসব ও মেলাকে নির্বিঘ্ন রাখতে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। দায়িত্ব পালন করছেন বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি র্যাব-১২-এর বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব ও লোকজ মেলা সোমবার (১৯ অক্টোবর) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে উৎসবের সুর ও লালনের মানবতাবাদী দর্শন ঘিরে সাধু-ভক্তদের যে মিলন ঘটেছে, তা ছেঁউড়িয়াকে আবারও বাংলার সমৃদ্ধ বাউল ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে।




















