খেলার মাঠে পশুর হাট: ধ্বংসের মুখে বনানীর ফুসফুস, ফুঁসছে জনতা
ছবি- সকালের বার্তা
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক মহাখালী টিএন্ডটি মাঠ। যেখানে ভোরের আলো ফুটতেই দাপিয়ে বেড়াত আগামীর ফুটবলার-ক্রিকেটাররা, সেখানে এবার বসতে যাচ্ছে কোরবানির পশুর হাট। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) এই সিদ্ধান্তে মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দা, ক্রীড়াবিদ ও পরিবেশবাদীরা। শুক্রবার সকালে মাঠ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধনে তারা সমস্বরে দাবি জানিয়েছেন— “গরুর হাট নয়, খেলার মাঠ চাই।”
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিগত কয়েক বছর আগেও এই মাঠে পশুর হাট বসানো হয়েছিল। ইজারার শর্ত অনুযায়ী হাট শেষে মাঠ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ইজারাদাররা তা মানেননি। হাটের বর্জ্য, খুঁটি গাড়ার গর্ত এবং পশুর মূত্র-গোবরে মাঠের মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েক বছর পার হলেও সেই ক্ষত এখনও শুকায়নি; সংস্কারের অভাবে মাঠটি এখনো খেলার অনুপযোগী হয়ে আছে। এর মধ্যেই নতুন করে ইজারা দেওয়ার ঘোষণাকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ডিএনসিসি’র প্রধান সম্পত্তি বিভাগ থেকে দরপত্র আহ্বানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই উত্তাল বনানী ও মহাখালী এলাকা। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ঢাকা-১৭ আসনের স্থায়ী বাসিন্দারা বলেন, এটি এই এলাকার একমাত্র উন্মুক্ত মাঠ।
স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক ফুটবলার আহসান হাবীব বলেন, “একটি মাঠ তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে, কিন্তু ধ্বংস করতে ১০ দিনের একটি পশুর হাটই যথেষ্ট। খুঁটি গাড়ার ফলে মাটির ড্রেসিং নষ্ট হয়, আর পশুর বর্জ্য মাঠের ঘাস ও উর্বরতাকে চিরতরে শেষ করে দেয়। আমরা কি আমাদের সন্তানদের খেলার বদলে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে চাই?”
অপূরণীয় ক্ষতির খতিয়ান বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয়দের মতে, পশুর হাট বসলে এই মাঠের তিনটি প্রধান ক্ষতি হবে:
হাজার হাজার পশুর বর্জ্য এবং মূত্র থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক মাঠের মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘদিন পচা গন্ধ ও জীবাণু এলাকায় রোগব্যাধি ছড়াতে পারে।
গবাদি পশুর ভারি চলাফেরা এবং অস্থায়ী শেড তৈরির জন্য গর্ত করার ফলে মাঠের সমতলতা হারায়। এটি ঠিক করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
মাঠ বন্ধ থাকায় কিশোর ও তরুণরা শরীরচর্চার সুযোগ হারাবে, যা তাদের ডিজিটাল আসক্তি বা বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ও আকুল আবেদন মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক তরুণ ক্রিকেটার আক্ষেপ করে বলেন, “মাঠ বাঁচলে ভবিষ্যৎ বাঁচবে। আমাদের প্র্যাকটিস করার আর কোনো জায়গা নেই। সিটি কর্পোরেশনের উচিত বিকল্প কোনো ফাঁকা জায়গায় হাটের ব্যবস্থা করা, খেলার মাঠকে বলি দিয়ে নয়।”
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর দাবি, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।
উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যদি শহরের গুটিকতক ফুসফুস বা উন্মুক্ত স্থান এভাবে বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া হয়, তবে ঢাকা অচিরেই বাসঅযোগ্য এক কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হবে। মহাখালী টিএন্ডটি মাঠ রক্ষা করা এখন কেবল বনানীবাসীর নয়, বরং সচেতন নাগরিক সমাজের নৈতিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
“মাঠ বাঁচাও, ভবিষ্যৎ বাঁচাও”
“খেলার মাঠে পশুর হাট, মানি না মানবো না”















