শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে সুনামগঞ্জের পাঁচ আসনের লড়াই বিএনপির এগিয়ে থাকা প্রচারণায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছে জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনেই শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। শুরুতে বিএনপি প্রার্থীরা একচেটিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও এখন জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোরালোভাবে লড়াইয়ে নামায় পাঁচ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি স্থানীয় নানা নেতিবাচক বিষয় সামনে এনে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহীদের ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
জেলার পাঁচটি আসনে এবার মোট ২৩ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ১৯ জন এবং ৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্রদের মধ্যে দু’জন বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যাদের ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও তাহিরপুর)
এই আসনে তিন দলের তিন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
বিএনপি: কামরুজ্জামান কামরুল — ধানের শীষ
জামায়াতে ইসলামী: তোফায়েল আহমদ — দাঁড়িপাল্লা
নেজামে ইসলাম পার্টি: মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক তালুকদার — বই
এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান থাকলেও তৃণমূলে বিভক্তিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে জামায়াত। দেড় বছরের নানা বিতর্কিত ইস্যু সামনে এনে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন জামায়াত প্রার্থী। সরজমিনে কথা হয়,কালাগুঁজা গ্রামের সাধারণ ভোটার আহছান মিয়া,ছিদ্দিক মিয়ার সাথে তাদের মতে বাংলাদেশের মানুষ দুইভাগে বিভক্ত একদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি অন্যদিকে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ, যেহেতু আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন সেহেতু বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে,জামায়াত প্রসঙ্গে বলেন,যেহেতু আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে নেই তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসবে জামায়েত।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা)
বিএনপি: মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী — ধানের শীষ
জামায়াতে ইসলামী: মোহাম্মদ শিশির মনির — দাঁড়িপাল্লা
কমিউনিস্ট পার্টি: নিরঞ্জন দাস — কাস্তে
এই আসনে জামায়াত প্রার্থী শিশির মনির দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। প্রচারণায় তিনি বিএনপি প্রার্থীর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক টানার কৌশলও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ)
এখানে সবচেয়ে বেশি ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
বিএনপি: মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ — ধানের শীষ
খেলাফত মজলিস: মোহাম্মদ শাহীনুর পাশা চৌধুরী — রিকশা
খেলাফত মজলিস: শেখ মুশতাক আহমদ — দেওয়াল ঘড়ি
এবি পার্টি: সৈয়দ তালহা আলম — ঈগল
স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী): মো. আনোয়ার হোসেন — তালা
স্বতন্ত্র: মাহফুজুর রহমান খালেদ (তুষার) — টেবিল ঘড়ি
স্বতন্ত্র: হুসাইন আহমদ — ফুটবল
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কয়ছর আহমেদের বিপক্ষে বিদ্রোহী আনোয়ার হোসেন আঞ্চলিকতা ও ‘কয়ছর-বিরোধী ভোট’ একত্র করার চেষ্টা করছেন। তবে প্রবাসী রাজনৈতিক নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে বিএনপি এখানে তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর)
বিএনপি: নূরুল ইসলাম — ধানের শীষ
স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী): দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন — মোটরসাইকেল
জাতীয় পার্টি: মো. নাজমুল হুদা — লাঙ্গল
জামায়াত: মো. সামছ উদ্দিন — দাঁড়িপাল্লা
ইসলামী আন্দোলন: শহীদুল ইসলাম — হাতপাখা
এখানে বিএনপির তরুণ কর্মীদের সক্রিয়তায় মাঠ বেশ গরম। তবে বিদ্রোহী ও জামায়াত প্রার্থী শেষ মুহূর্তে লড়াই জোরদার করার চেষ্টা করছেন।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার)
বিএনপি: কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন — ধানের শীষ
জামায়াত: আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম — দাঁড়িপাল্লা
খেলাফত মজলিস: মোহাম্মদ আব্দুল কাদির — দেওয়াল ঘড়ি
জাতীয় পার্টি: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম — লাঙ্গল
এনপিপি: মো. আজিজুল হক — আম
এই আসনে তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলনের প্রচারণার গতি জামায়াত প্রার্থীর তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
ভোটার ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা
জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে ৮টিই হাওরবেষ্টিত। পাঁচ আসনে মোট ভোটার ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন।
ভোটকেন্দ্র ৭২০টি, ভোটকক্ষ ৪,২৫০টি—এর মধ্যে ৩২৩টি দুর্গম।
ভোটগ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ১৪,১৪৬ জন কর্মকর্তা।
দেশ ও দেশের বাইরে ১৮,০৮৭ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি তদারকিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ভিজিল্যান্স টিম, ইনকোয়ারি কমিটি ও অবজারভেশন টিম মাঠে রয়েছে।
রাজনৈতিক বক্তব্য, জামায়াতের নেতা অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা মানিক বলেন, “প্রাকৃতিক সম্পদ লুট, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই আমরা মানুষের আস্থা পেয়েছি।”জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য জালাল উদ্দীন রুমি বলেন, “ধানের শীষের জোয়ার কেউ ঠেকাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ ।
পাঁচ আসনেই বিএনপি জয়ী হবে ইনশাল্লাহ।” রহিছ উদ্দিন আহমদ সাবেক সেনাকর্মকর্তা তিনি বলেন, “পাঁচটি আসনেই নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নিরব ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।”
সারসংক্ষেপ
শেষ মুহূর্তে সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনেই ভোটের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি। বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কৌশলী প্রচারণা ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।















