সুনামগঞ্জে আগাম বোরো ধান কাটার উৎসব, ভালো ফলনে হাসছে কৃষক
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম জাতের বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে, আর এতে কৃষকদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। চৈত্রের শেষ এবং বৈশাখের শুরুতেই জেলার মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটার ব্যস্ততা চোখে পড়ছে।
জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনে, আবার কোথাও স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে ধান কাটা চলছে পুরোদমে। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে হাওরপাড়ের কৃষক ও কৃষাণীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে আগাম জাতের ব্রি-৯৬সহ বিভিন্ন জাতের ধান ৬ হাজার ৭৩৫ হেক্টরের মধ্যে প্রায় ১১৪ হেক্টর জমিতে কাটা হয়েছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল আহাদ জানান, আগাম জাতের ব্রি-৯৬ ধানের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। একই উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়নের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্রি ধান-২৮ কাটার পর প্রতি কেয়ারে প্রায় ১৮ মণ ফলন পাওয়া গেছে, যা তাদের আশাবাদী করে তুলেছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের কৃষক গফুর মিয়া জানান, তিনি ১০ কেয়ার জমিতে ব্রি-৯৬ ধানের চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কেয়ার জমির ধান কাটা হয়েছে এবং প্রতি কেয়ারে প্রায় ১৮ মণ ফলনের আশা করছেন। তিনি বলেন, এই জাতের ধানের চাল চিকন, সুস্বাদু এবং উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে তারা লাভবান হচ্ছেন।
ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক ও ৫৭৭টি কম্বাইন হারভেস্টার মাঠে কাজ করছে। শ্রমিক আফতাব জানান, তারা দলবদ্ধভাবে কাজ করছেন এবং আগাম ধান চাষের কারণে বৈশাখের আগেই কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
তবে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কিছু হাওরে পানি ঢুকে পড়ায় ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটছেন। পাকনার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, দেখার হাওর, খরচার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, কম্বাইন হারভেস্টারের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও ৫০টি হারভেস্টার ভাড়ায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জের প্রধান ফসল বোরো ধান। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। ব্রি ধান-২৮ ও ব্রি-৯৬ জাতের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকেরা সন্তুষ্ট। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে ভালো উৎপাদন ও লাভের আশা করা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হাওরের মাঠজুড়ে এখন ধান কাটার উৎসব—কৃষকের হাসি আর ব্যস্ততায় মুখর পুরো জনপদ।

















