কেন্দ্রে হাঁটু পানি, মোমবাতি আর আমাদের বোধদয়
ছবি: আমিনুল ইসলাম, সহকারি শিক্ষক
সহকারি শিক্ষকশিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার। সুষ্ঠু ও যুগপোযোগী শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শুধু সার্টিফিকেট অর্জন বা ডিগ্রি লাভ শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। মানবীয় গুণাবলী যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে সে অর্জন বৃথা। শিখনের মূল উদ্দেশ্যকে আঁকড়ে ধরে শিক্ষা এগিয়ে যায়। চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগের আর ৫ বিষয়ের পরীক্ষার পর চিত্রটা ভিন্ন। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপ্রত্রের ধরন, সিসি টিভির ব্যবহার, নতুন শিক্ষামন্ত্রী সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ছিল উৎকণ্ঠায়। উদ্বেগের মধ্যেই সময় কাটছিল প্রথম পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষার পর আমরা কি দেখলাম? শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রল করা। ব্যঙ্গ আর তাচ্ছ্বিল্যতা। সচেতনমহল থেকে শুরু করে অভিভাবকরাও চিন্তিত। তাঁদের কোমলমতি সন্তানেরা শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে বাজে মন্তব্য আর হাসাহাসি আর তুচ্ছজ্ঞান করছে। তাঁকে নিয়ে মজা লুটছে। কেমন যেন এক নিষিদ্ধ আনন্দ তাঁদের বাচ্চাদের ঘিরে রেখেছে। মত্ত তারা। প্রচ্ছন্ন হয়ে পরেছে এক অধরা শক্তির কাছে। কিন্তু সেটা কি?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে খবরগুলি চড়াও করে প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। তাহলে কি বিদ্যালয়গুলি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছে না আমাদের সন্তানদের? পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার পরও কি আমাদের সন্তানেরা অপরিপূর্ণ? মেধার বিকাশ কি ঘটছে না? নৈতিক মূল্যবোধ আর সম্মান জানানোর সঠিক পন্থা কি জানে না তারা? তাঁদের কি বিকারগ্রস্থ বলা যাবে?
“না”। অনেকের উত্তর হবে। যুক্তিতে বলবেন, কোমলমতি ও ছোট বাচ্চা সবাই। এরকম হতেই পারে। টিনএইজ বলে কথা। কৈশোরের মন-মর্জি। মনে রাখবেন, কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করবে ঠ্যাঁস ঠ্যাঁস। যে সন্তান এই ছোট বয়সেই একজন বয়োজষ্ঠ্যকে ট্রল করতে দ্বিধা করছে না, নিশ্চিত জেনে রাখুন, সে অন্যকেও (আপনাকেও)সম্মান করবে না। এটাই প্রকৃতির শিক্ষা।
গত বুধবারের খবরে জানা গেছে, কালবৈশাখী ও ভারী বৃষ্টিপাতে কুমিল্লা শহর জুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। একটি এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রায় হাঁটুপানি। পানির ভেতর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। অনেকেই আবার বেঞ্চে পা তুলে লিখছে। সেই সাথে অভিভাবকরাও বিপাকে পরেছে। তাঁদের আশেপাশের কোন উঁচু স্থানে জায়গা হয়েছে। অভিভাবকদের প্রশ্ন, যদি উত্তরপত্র বা প্রশ্নপত্র পানিতে পড়ে গেলে কি হবে? এতদিনের স্বপ্নের পরীক্ষা এক নিমিষেই বিষাদে পরিনত হবে। অথবা কোনভাবেও যদি পানি উত্তরপত্রে ছোঁয়া লাগে। তাহলে পরীক্ষায় বৃথা।
এবছর চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে মোমবাতি জ্বালিয়ে ইংরেজি ২পত্র পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধাকারচ্ছন্ন ঘরে চার্জার ও মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয় তারা। এদিকে আকাশ মেঘাছন্ন থাকায় প্রশ্নপত্র ভাল করে দেখাই যাচ্ছিলো না। অন্যদিকে ভ্যাপসা গরমে সবাই নাজেহাল।
কেন্দ্রে হাঁটু পানি, মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি ২০২৬ সালের শিক্ষার্থীরা, এমন খবর চড়াও করে প্রকাশিত হচ্ছে। বাদ যায়নি বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে চলতি বছরের শিক্ষার্থীদের ট্রল। হাঁটু পানি বা মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এর চেয়ে ভাল কিছু শিখবে না তারা। কথায় আছে, জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো।
বিষয়টা ঠিক এমন নয়, যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রল করায় হাঁটু পানি বা মোমবাতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। প্রকৃতির নিয়ম এটা। এ নিয়ম অলঙ্ঘনীয়। এসময় বৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় হবেই। তবে পরীক্ষা এই সময়ে (এপ্রিল-অক্টোবর) এড়িয়ে চলায় ভাল।
কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথায় মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা চলছে। এখন প্রশ্ন: সমস্যা কোথায়? পরীক্ষার সময় কি বৃষ্টি হওয়া যাবে না। না-কি বৃষ্টির সময় পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। মূল বিষয় হলো: এপ্রিল মাসে বৃষ্টি শুরু হয়। এছাড়াও অন্যান্য এলাকায় পাহাড় ধ্বস এবং বন্যা শুরু হয়। যদি আমরা বছরের শুরুতেই বা এমন একটি সময় নির্ধারণ করতে হবে যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব হয়। নচেৎ- বৈশাখ মাসে পরীক্ষা চলবে আর কালবৈশাখী ঝড় বা বৃষ্টি হবে না, এটা তো মানবে না প্রকৃতি।
সম্ভবত: এসব বিষয় দেখে শুনে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন এমপি ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরের মধ্যই শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন। বিষয়টিকে পজেটিভ মনে হচ্ছে। তবে, শিক্ষার্থীরা বলছে, আমাদের সাথে তাহলে বৈষম্য করা হবে। কারন চলতি বছরের চতুর্থ মাসের শেষের দিকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেই হিসেবে ২০২৭ সালের এপ্রিলে আমরা পরীক্ষা দিলে একটা যুৎসই ব্যাপার মনে হবে। কিন্তু ডিসেম্বর মানে আমরা প্রায় ৫ মাস কম পাবো। এটা কিভাবে আমরা মেনে নিব। এক দেড় মাস হলে মানা যায়। কিন্তু পুরো ৫ মাস।
কথায় আছে, বাছুর পুছে কখনো হালচাষ হয় না। সেজন্য কে, কখন, কবে পরীক্ষা চাইলো তার চেয়ে শঙ্কা ও দ্বিধাহীনভাবে পরীক্ষায় বসতে পারাটাই প্রশ্ন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবেই। এটা আমরা রুখতে পারবো না। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়িয়ে আমাদের সন্তানেরা যেন স্বাভাবিক, সুস্থ ও মনরোম পরিবেশে দ্বিধাহীনভাবে পরীক্ষায় বসতে পারে। এমনটায় প্রত্যাশা সকলের।
আমিনুল ইসলাম
সহকারি শিক্ষক
কোমারপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়
আদমদীঘি, বগুড়া।















