মিলাদুন নবী—ভালোবাসা, নাকি দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন
রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর জীবন, চরিত্র, সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা কি এমন কোনো ধর্মীয় রীতি চালু করতে পারি, যা তিনি নিজে করেননি এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামও করেননি? প্রশ্নটি আবেগের নয়; এটি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিবেচনার বিষয়।
আজ মুসলিম সমাজে মিলাদুন নবী বা রাসূল ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। কেউ এটিকে ভালোবাসা ও শুকরিয়ার প্রকাশ মনে করেন, আবার অনেক আলেম এটিকে বিদআত হিসেবে গণ্য করেন। বিষয়টি নিয়ে মতভেদ থাকলেও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমাদের ফিরে যেতে হবে রাসূল ﷺ-এর সহিহ নির্দেশনার কাছে।
বিদআত সম্পর্কে রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
—সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮।
আরেক হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন—
“নিশ্চয়ই সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হলো মুহাম্মদ ﷺ-এর পথ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিষয়; প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।”
—সহিহ মুসলিম: ৮৬৭।
এখানে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার—দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন ইবাদত বা ধর্মীয় রীতি সংযোজন করা যাবে না, যার ভিত্তি রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহতে নেই।
রাসূল ﷺ নিজের জন্মদিন কীভাবে স্মরণ করেছেন?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো সহিহ মুসলিমের হাদিস।
আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ-কে সোমবার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—
“এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।”
—সহিহ মুসলিম: ১১৬২।
খেয়াল করার বিষয় হলো, রাসূল ﷺ তাঁর জন্মের দিনের কথা স্মরণ করেছেন; কিন্তু তিনি প্রতি বছর জন্মদিন উপলক্ষে কোনো উৎসব, মিছিল, বিশেষ মাহফিল বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার নির্দেশ দেননি। বরং তাঁর নিজের আমল ছিল সোমবার রোজা রাখা।
যদি জন্মদিনকে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা ইসলামের একটি নির্ধারিত আমল হতো, তাহলে রাসূল ﷺ অবশ্যই তাঁর উম্মতকে তা শিক্ষা দিতেন। কিন্তু সহিহ হাদিসে এমন কোনো নির্দেশ আমরা পাই না।
সাহাবায়ে কেরাম কি মিলাদ পালন করেছেন?
রাসূল ﷺ-এর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষ। তাঁরা রাসূল ﷺ-এর কথা, কাজ ও সুন্নাহ অনুসরণ করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.), আলী (রা.)—কেউ তাঁর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে বার্ষিক মিলাদ অনুষ্ঠান করেননি।
তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের যুগেও এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না যে তাঁরা প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে রাসূল ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছেন।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—
যে কাজটি রাসূল ﷺ-এর সবচেয়ে প্রিয় সাহাবীরা করেননি, সেটিকে পরবর্তী সময়ে দ্বীনের বিশেষ আমল হিসেবে আমরা কীভাবে নির্ধারণ করব?
“ভালো কাজ” হলেই কি ইবাদত হিসেবে যোগ করা যায়?
এখানেই মূল বিষয়টি বোঝা জরুরি।
কোরআন তিলাওয়াত ভালো কাজ। দরুদ পাঠ ভালো কাজ। রাসূল ﷺ-এর সীরাত আলোচনা ভালো কাজ। দান-সদকা ভালো কাজ।
কিন্তু কোনো ভালো কাজকে একটি নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে নিয়মিত ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলে তার জন্য শরিয়তের দলিল প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ, রাসূল ﷺ যদি কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটিই সুন্নাহ। কিন্তু আমরা নিজেরা নতুন করে কোনো সময় বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে সেটিকে বিশেষ সওয়াবের ধর্মীয় আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”
—সহিহ মুসলিম: ১৭১৮।
অতএব প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, মিলাদে কী করা হয়। প্রশ্ন হলো—মিলাদকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দলিল কোথায়?
রাসূল ﷺ-এর জন্মতারিখ নিয়েও সতর্কতা প্রয়োজন
অনেকের ধারণা, ১২ রবিউল আউয়ালই রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন। কিন্তু সহিহ হাদিসে তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই।
সহিহ হাদিসে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলো—তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন।
৯ রবিউল আউয়ালকে জন্মতারিখ হিসেবে গ্রহণ করেছেন কিছু সীরাত গবেষক। আবার ১২ রবিউল আউয়ালও বহুল প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক মত। কিন্তু ৯ বা ১২ রবিউল আউয়াল—কোনোটিকেই সহিহ হাদিসের অকাট্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
১২ রবিউল আউয়াল যদি ইন্তেকালের দিন হয়?
ঐতিহাসিকভাবে ১২ রবিউল আউয়ালকে রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকালের দিন হিসেবে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়। আবার এ তারিখ নিয়েও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে।
সহিহ হাদিসে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত বিষয় হলো—রাসূল ﷺ সোমবার ইন্তেকাল করেছেন।
তাই কেউ যদি ১২ রবিউল আউয়ালকে তাঁর ইন্তেকালের দিন হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে একই দিনে আনন্দ-উৎসব করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
রাসূল ﷺ-এর ইন্তেকাল ছিল উম্মাহর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। তাই সেই দিনকে কেন্দ্র করে উৎসবের পরিবর্তে তাঁর সীরাত আলোচনা, তাঁর সুন্নাহ স্মরণ, দরুদ পাঠ, দোয়া ও নেক আমলের দিকে মানুষকে আহ্বান করা অধিক অর্থবহ হতে পারে।
তবে ন্যায়সংগতভাবে বলতে হবে—১২ রবিউল আউয়াল তাঁর ইন্তেকালের দিন—এটিও সহিহ হাদিসে সরাসরি নির্ধারিত নয়।
রাসূল ﷺ-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা কী?
রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
—সূরা আল-আহযাব: ২১।
তাই রাসূল ﷺ-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হলো—
তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর চরিত্র গ্রহণ করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা, মানুষের হক আদায় করা, গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো, সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা এবং তাঁর শেখানো তাওহিদ ও ইসলামের পথে জীবন পরিচালনা করা।
রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসার দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে তাঁর সুন্নাহ আমাদের জীবনে কতটুকু আছে—সেটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তাহলে মিলাদ কি অবশ্যই বিদআত?
এখানে সতর্ক ও ন্যায়সঙ্গত ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন।
যদি মিলাদুন নবীকে রাসূল ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা বিশেষ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার নির্দেশ রাসূল ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম বা প্রথম যুগের মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না, তাহলে এটিকে বিদআত বলার পক্ষে শক্তিশালী শরয়ি যুক্তি রয়েছে।
কারণ রাসূল ﷺ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজনের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।
তবে কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় দিবসকে শরিয়ত-নির্ধারিত উৎসব মনে না করে সাধারণভাবে কোরআন তিলাওয়াত, সীরাত আলোচনা, দরুদ, দোয়া বা দান-সদকার আয়োজন করেন, তখন বিষয়টির ফিকহি ব্যাখ্যায় আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই মতভিন্নতার কারণে পরস্পরকে গালি দেওয়া বা ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।
আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
দ্বীনের বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—যেখানে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ প্রমাণিত, সেখানে দৃঢ়ভাবে তা অনুসরণ করা; আর যেখানে সুন্নাহর প্রমাণ নেই, সেখানে দ্বীনের নামে নতুন কিছু প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
রাসূল ﷺ-এর জন্মের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত সহিহ আমল আমাদের সামনে আছে—সোমবার রোজা।
তাঁর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণও আমাদের সামনে আছে—তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—
আমরা কি শুধু রাসূল ﷺ-এর জন্ম নিয়ে অনুষ্ঠান করব, নাকি তাঁর জীবনাদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করব?
রাসূল ﷺ-এর জন্মের আলোচনা হোক, তাঁর সীরাত আলোচনা হোক, তাঁর ওপর দরুদ পাঠ হোক—কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হোক কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ।
কারণ রাসূল ﷺ-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়; তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনাই সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
মোঃ মিজানুর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক
দৈনিক সকালের বার্তা








