খনিজ সম্পদ, শিল্প ও যোগাযোগের কেন্দ্র মধ্যপাড়া: উপজেলা ঘোষণার দাবি জোরালো
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ১০ নম্বর হরিরামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মধ্যপাড়া আজ শুধু একটি খনিজ শিল্পাঞ্চলের নাম নয়; এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র কঠিন শিলা খনি, বৃহৎ বনভূমি, রেল যোগাযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং সুবিধা ও শিল্প অবকাঠামোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মধ্যপাড়াকে নতুন উপজেলা ঘোষণার দাবি দীর্ঘদিনের।
স্থানীয়দের মতে, পার্বতীপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধ্যপাড়া ও আশপাশের এলাকার মানুষকে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে এবং সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে মধ্যপাড়াকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা সময়ের দাবি।
খনিজ সম্পদের প্রাণকেন্দ্র
মধ্যপাড়ায় অবস্থিত দেশের একমাত্র কঠিন শিলা খনি প্রকল্প— মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড। এই খনি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া খনিজ শিল্পাঞ্চল থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এবং বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রশাসনিক ও আর্থিক অবকাঠামো
মধ্যপাড়ায় রয়েছে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, কঠিন শিলা খনির নিরাপত্তার জন্য পৃথক পুলিশ ক্যাম্প, সোনালী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এলাকাটি ইতোমধ্যেই একটি আঞ্চলিক প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও মধ্যপাড়া পিছিয়ে নেই। এখানে রয়েছে মধ্যপাড়া মহাবিদ্যালয়, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইন স্কুল, মধ্যশিলা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের মতে, উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষা খাতে আরও ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় কৌশলগত অবস্থান
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক মধ্যপাড়ার বুক চিরে চলে গেছে। সড়কপথে সৈয়দপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর এবং হিলি স্থলবন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া মধ্যপাড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম রেলওয়ে স্টেশন এলাকাটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা
খনিজ শিল্পাঞ্চল থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র স্বপ্নপুরী। ফলে শিল্প, পর্যটন ও যোগাযোগের সমন্বয়ে মধ্যপাড়া একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক জোন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
চার উপজেলার সংযোগস্থলে মধ্যপাড়া
মধ্যপাড়া মূলত চারটি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলো হলো রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও ফুলবাড়ী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য মধ্যপাড়া একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন
মধ্যপাড়া উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে ২০১১ সালের ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। প্রস্তাবিত উপজেলার আওতায় পার্বতীপুরের হামিদপুর, পলাশবাড়ী ও হরিরামপুর ইউনিয়ন এবং নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ও কুশদহ ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
রয়েছে পর্যাপ্ত সরকারি জমি
মধ্যপাড়ায় বন বিভাগের প্রায় ২,২০০ একর বনভূমি রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, উপজেলা প্রশাসনিক কমপ্লেক্সসহ প্রয়োজনীয় সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমি এখানে বিদ্যমান।
জনদাবির প্রতিফলন
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খনিজ সম্পদ, শিল্প, শিক্ষা, ব্যাংকিং, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সুবিধার বিচারে মধ্যপাড়া অনেক আগেই উপজেলা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে লাখো মানুষের প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ সহজ হবে, ত্বরান্বিত হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় উন্নয়নেও নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় মধ্যপাড়াকে দ্রুত নতুন উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করবে।












