লক্ষ্মীপুরে একই পরিবারের চারজনকে গলা কেটে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতকের মৃত্যু
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে এক ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার দেনায়েতপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসা থেকে একই পরিবারের মা ও তিন মেয়েসহ মোট চারজনকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। এদিকে, হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে এক সন্দেহভাজন ঘাতকেরও মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা হলেন— কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের প্রয়াত মো. কামালের স্ত্রী শাহীনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ছায়মা (২১), মেজ মেয়ে কলেজছাত্রী ইকরা আক্তার (১৮) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে শাহীনুর বেগমের স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে শাহীনুর বেগম রায়পুর পৌর শহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দেনায়েতপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে সেখানেই চলত তাদের দিনকাল।
প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। তবে সকালের কোনো এক সময়ে ঘাতক বা ঘাতকের দল ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওই বাসায় প্রবেশ করে এবং শাহীনুর বেগমসহ তার তিন মেয়ের ওপর আকস্মিক ও নৃশংস হামলা চালায়। দুর্বৃত্তরা তাদের এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গলা কেটে গুরুতর জখম করে।
চিৎকার ও হট্টগোল শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মা শাহীনুর বেগম, মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, বড় মেয়ে ছায়মার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ঢাকা নেওয়ার পথেই ছায়মা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বলে পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে স্থানীয় বাসিন্দারা সন্দেহভাজন হিসেবে এক ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতাকে হাতেনাতে আটকে ফেলে। উত্তেজিত জনতা তাকে গণধোলাই দিলে সে গুরুতর আহত হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই যুবকেরও মৃত্যু হয়। তবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে ওই ফল বিক্রেতার প্রকৃত সম্পৃক্ততা কতটুকু ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং বিষয়টি পুলিশের তদন্তাধীন রয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে জেলা পুলিশ ও রায়পুর থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সিআইডি এবং পিবিআই-এর বিশেষ টিমও আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রায়পুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রাশেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান,
”ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান এবং একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উত্তেজিত জনতা সন্দেহভাজন এক যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে, যে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বর্তমানে ঘটনাস্থল ও আশপাশের পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কী এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছি।”
এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর পুরো রায়পুর পৌর শহরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।















