যুবলীগ থেকে কৃষক লীগ, ভোল পাল্টে এখন ‘বড় মাপের’ সাংবাদিক
রাজনীতি আর সাংবাদিকতা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শ ও পেশাদারিত্বের জায়গা। কিন্তু মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় এই দুই মেরুকে এক সুতোয় গেঁথে এক অভিনব ও বিতর্কিত সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে হেমায়েত হোসেন খান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একসময় মাঠপর্যায়ের দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এই নেতা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি খোলস বদলে বনে গেছেন ‘বড় মাপের’ সাংবাদিক ও সম্পাদক। মূলত সম্ভাব্য আইনি ঝামেলা ও মামলা থেকে বাঁচতে গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার রাজনৈতিক ডিগবাজি এবং সাংবাদিকতার নামে অঞ্চলজুড়ে চালানো এক বিশাল অপকর্মের খতিয়ান।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘আন্ডার-মেট্রিক’, হারিয়েছেন মুহুরীর পদও
অনুসন্ধানে জানা যায়, হেমায়েত হোসেন খান একসময় মাদারীপুর জজ কোর্টে আইনজীবীর সহকারী (মুহুরী) হিসেবে কাজ করতেন। তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনজীবীর সহকারী হতে হলে সর্বনিম্ন এসএসসি বা সমমান পাস হওয়া বাধ্যতামূলক। হেমায়েত মেট্রিক পাস করতে না পারায় এবং কোনো বৈধ সার্টিফিকেট দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় আইনি বেড়াজালে শেষ পর্যন্ত আইনজীবীর সহকারীর পদটি হারান। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, মেট্রিক ফেল করে আদালতের মুহুরীর পদ হারানো সেই ব্যক্তিই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বড় মানের সাংবাদিক ও পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নেটিজেনরা তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মোহাম্মদ শামীম হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেছেন, “ও তো মূর্খ কিসের সাংবাদিক। সাংবাদিক হতে হলে কি কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগেনা?”
রাজনৈতিক খোলস বদল ও রাতারাতি সাংবাদিকতার ‘আলাদিনের চেরাগ’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হেমায়েত হোসেন খান ইতিপূর্বে ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষমতার চাকা ঘোরার সাথে সাথে তিনি ডাসার উপজেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়কের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। কিন্তু রাজনৈতিক এই পরিচয়ের আড়ালে গত কয়েক বছরে তার মূল পরিচিতি হয়ে উঠেছে একজন প্রভাবশালী ‘সাংবাদিক’ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমডি রিয়াদ হোসেন নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “ছেলে করে ছাত্রলীগ, বাবা করে কৃষকলীগ। গরু চোরা এখন হইছে সাংবাদিক।” একইভাবে মো. মিলন নামের একজন ভুক্তভোগী দাবি করেন, “হাসিনার আমলের দোসর হেমায়েত আমাদের কে মিথ্যা মামলা এক নম্বর সাক্ষী ছিল ২০১৭ সালে।”

অপরাধের সাম্রাজ্য ও ‘কার্ড বাণিজ্য’
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা গণমাধ্যমের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও হেমায়েত হোসেন খান নিজেকে একটি পত্রিকার সম্পাদক ও বড় মাপের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। যুবলীগ থেকে কৃষক লীগের শীর্ষ পদ, আর হাতে তথাকথিত সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র—এই ত্রিমুখী ক্ষমতাবলয় ব্যবহার করে ডাসার ও গোপালপুর এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন তিনি। নিজেই চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং ও প্রতারণাসহ নানা অপরাধের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক বাড়াতে তিনি খুলেছেন ‘প্রতিদিনের ক্রাইম’ নামের একটি অনলাইন পেজ ও পোর্টাল। এখানেই থেমে নেই, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সারাদেশ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে পুরোদস্তুর ‘সম্পাদক’ বনে গেছেন তিনি। তার এই কথিত সাংবাদিক সেজে ও ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি চিত্র ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফোন আলাপের থাম্বনেইল, যেখানে লেখা রয়েছে—”কথিত সাংবাদিক হেমায়েত হোসেন খান ওসি, র্যাবের ভয় দেখিয়ে টাকা নিলো।” ওই পোস্টগুলোর নিচে রাসেল হাসান নামের একজন লিখেছেন, “আগে ছিল চোর এখন সাংবাদিক।” আবার আরএস রনি হোসাইন মন্তব্য করেছেন, “আগে আছিল চোর তারপর পুলিশের দালাল তারপরে কোডের চামচা এখন আবার সাংবাদিক।” উজ্জল বৈদ্য নামের অপর একজন তার অবস্থান নিশ্চিত করে লিখেছেন, “ওকে এসে ধরেন, ওর বাড়ি মাদারীপুর পাথরিয়ার পার।”
এছাড়া মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকার দোকানপাট থেকে বাকিতে লেনদেন করে সেই টাকাও পরিশোধ করছেন না তিনি।টাকা চাইলে দেওয়া হচ্ছে নিউজ করে দেওয়ার হুমকি। তার এহেন কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ জনতা তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলা মার্কেটের ব্যবসায়ী আল আমিন মিয়া অভিযোগের সুরে বলেন, সাংবাদিক হেমায়েত হোসেন খান, আরো প্রায় তিন/চার বছর আগে আমার দোকান থেকে ১২০০ টাকা বাকি খেয়ে সেই টাকা এখনো দেননি। টাকা চাইলে তিনি সাংবাদিকতার প্রভাব দেখান।
জেলার ডাসার উপজেলার ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার বাইজিদ হোসেন। তিনি জানান, তাদের পারিবারিক বিষয়ে ঝামেলা চলছিল। হঠাৎ এক ব্যক্তি এসে ভিডিও ধারণ শুরু করে। তার নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, তার নাম সাংবাদিক হেমায়েত হোসেন খান।
ভিডিও ধারণ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে বলেন,আপনাদের ভিডিও আমাদের কাছে আছে, আমরা যেহেতু এসেছি আমরা নিউজ করবো।অত:পর নিউজ না করার শর্তে দাবি করা হয় ৫ হাজার টাকা।ফ্যামিলির পক্ষ থেকে এক হাজার টাকা দেয়া হলেও নিতে রাজি নন তিনি।
দিতে হবে পুরো ৫০০০ টাকা-ই।
এক পর্যায়ে,পরিবারের সবাই মিলে প্রতিরোধ করে তুললে টাকা না নিয়েই পালিয়ে যান তিনি।
ক্ষুব্ধ পেশাদার সাংবাদিক ও সচেতন মহল
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডাসারের এক প্রবীণ গণমাধ্যমকর্মী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সাংবাদিকতা এখন আর মেধা বা নৈতিকতার পেশা নেই। যুবলীগ-কৃষক লীগের পদধারী নেতারা যখন নিজেদের সম্পাদক দাবি করেন এবং টাকার বিনিময়ে কার্ড বিক্রি করেন, তখন পেশাদার সাংবাদিকদের মাঠে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও এদের রাজনৈতিক পরিচয় আর সাংবাদিকতার ডাবল খোলসের কারণে সমীহ করে চলতে বাধ্য হন।”
রাজনৈতিক ব্যানারে নিজেকে দলীয় কর্মী দাবি করা ব্যক্তি যখন সাংবাদিকতার কার্ডকে ঢাল বানিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম পরিচালনা করেন, তখন মাঠপর্যায়ে মূলধারার সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি মারাত্মক সংকটে পড়ে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত হেমায়েত হোসেন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডাসার ও কালকিনি সহ মাদারীপুরের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের দাবি, এই ছদ্মবেশী ও ভুঁইফোড় সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কথিত “প্রতিদিন ক্রাইম নামক পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দিয়ে চলার বৈধতা এবং তার আয়ের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। হেমায়েতের মতো অপসাংবাদিকদের হাত থেকে মাদারীপুরের গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে প্রশাসনের নীরবতা ভাঙার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।















