বিদ্যালয়ে ‘পরিবারতন্ত্র’ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ: প্রধান শিক্ষক আমানতের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
একই বিদ্যালয়ে স্ত্রী, ভাই, বোনজামাই ও আত্মীয়দের চাকরি; গোপন নিয়োগ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।যশোরের মণিরামপুর উপজেলার জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘পরিবারতন্ত্র’, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শিক্ষানীতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর বিরুদ্ধে। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন মহলের অভিযোগ, সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি বিদ্যালয়টিকে কার্যত নিজের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, একই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আমানত আলী নিজে। এছাড়া সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তার স্ত্রী, ভাই, বোনজামাই এবং বোনের নাতিসহ একাধিক আত্মীয়স্বজন। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের আত্মীয়কেন্দ্রিক নিয়োগ শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বিগত বছরের তারিখ ব্যবহার করে নতুন করে তিনটি পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের নিয়মিত রেজুলেশন ছাড়াই তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত নথি ব্যবহার করে এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের এমপিওভুক্তও করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানে কবে, কীভাবে এবং কারা নিয়োগ পাচ্ছেন—সে বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষকই কিছু জানেন না। নিয়োগ প্রক্রিয়া গোপনে সম্পন্ন করা হয় এবং পরে বিষয়টি জানাজানি হয়।
রোববার (১৩ জুন) সকালে কথিত নতুন তিনটি নিয়োগের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চান। এ সময় তাদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক অশালীন আচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে স্থানীয়রা তাকে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিবেচনায় তাকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
এদিকে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা দাবি করেন, তিনি প্রধান শিক্ষক আমানত আলীর প্রথম স্ত্রী। তার অভিযোগ, দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পরও পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল না হয়ে প্রধান শিক্ষক দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এবং বর্তমানে আলাদা বসবাস করছেন।আরেক শিক্ষিকার ভাষ্য, “সরকারি নিয়োগে আসা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।”
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, যিনি নিজেই নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ, তিনি শিক্ষার্থীদের কী ধরনের শিক্ষা দেবেন? তাদের দাবি, বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক মো. আমানত আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি শিক্ষা ও নৈতিকতা গড়ার কেন্দ্র, নাকি ব্যক্তিস্বার্থ ও আত্মীয়করণের নিরাপদ আশ্রয়স্থল? জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।













