‘আম্মা প্রতিদিন সকালে খনির গেইটের দিকে চাইয়া থাকে, আর আব্বা কোর্টের কাগজের দিকে।’
বাবার চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন হুমায়ুন কবির। তাঁর বাবা ওই খনির একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী। দীর্ঘদিন চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় বাবার পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
শুক্রবার সকালে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খনিকর্মীদের চাকরি স্থায়ীকরণ, আইনগত পাওনা পরিশোধ ও আদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন ও সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে শ্রমিকদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্য ও সন্তানেরাও অংশ নেন।
১৯৯৯ ও ২০০০ সালের নিয়োগে যোগদান
ভুক্তভোগী শ্রমিকদের দাবি, ১৯৯৯ ও ২০০০ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁরা মধ্যপাড়া পাথরখনিতে কাজে যোগ দেন। দীর্ঘদিন খনিতে কাজ করলেও তাঁদের চাকরি স্থায়ী করা হয়নি।
চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, আন্দোলন এবং আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান শ্রমিকেরা। তাঁদের ভাষ্য, আদালতের মাধ্যমে তাঁদের পক্ষে রায় পাওয়ার পরও সেই রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
তবে কোন আদালতের কোন মামলায় কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট রায়ের নথি প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে শ্রমিকদের দাবিকেই তাঁদের বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সন্তানদের চোখে পরিবারের অনিশ্চয়তা
মানববন্ধনে শ্রমিকদের পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবার চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় খনির প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়ান হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, তাঁর বাবার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে খনিতে কাজ করে। কিন্তু চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় পরিবারকে এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
শ্রমিকদের সন্তানদের কয়েকজন জানান, বাবাদের চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় পরিবারের আয়-ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে তাঁদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।
এক শ্রমিকের সন্তান বলেন, ‘আমাদের বাবারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় এই পাথরের খনিতে কাজ করেছেন। তাঁদের চাকরি ও পাওনা নিশ্চিত না হলে আমাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।’
শুধু চাকরি নয়, পরিবারের ভবিষ্যতের প্রশ্ন
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের চাকরির অনিশ্চয়তা শুধু তাঁদের কর্মজীবনেই সীমাবদ্ধ নেই। পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার ব্যয় নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন তাঁরা।
শ্রমিকদের দাবি, বয়স বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেকের জন্য সীমিত হয়ে এসেছে। ফলে দীর্ঘদিন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেখানে চাকরির নিশ্চয়তাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত সিদ্ধান্ত চান শ্রমিকেরা
মানববন্ধনে শ্রমিকেরা তাঁদের নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান।
তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খনিকর্মীদের চাকরি স্থায়ীকরণ, আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং আইনগতভাবে প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ।
শ্রমিকদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের এই বিরোধের স্থায়ী সমাধান হলে শুধু তাঁদের নয়, পরিবারের সদস্যদেরও অনিশ্চয়তা কাটবে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপাড়া খনির কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানটির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি—দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের চাকরি ও আইনগত পাওনার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।