ইয়াবাসহ এনসিপি নেতা গ্ৰেপ্তার

সারাদেশ

বন্যা মোকাবিলায় সব মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজের আহ্বান

রাজনীতি

শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে উত্তাল দেশ, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে দুঃখ প্রকাশ ও পুনঃপরীক্ষার ঘোষণা

সারাদেশ

টাঙ্গাইলের শাড়ি দেশ ও বিদেশে রয়েছে বেশ কদর

লাইফস্টাইল

প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

পুলিশের ‘সোর্স’ পরিচয়ে মাদকের রমরমা বাণিজ্য: আতঙ্কে বনানীর সাধারণ মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধী দমনে পুলিশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ‘সোর্স’ বা তথ্যদাতা। অপরাধ জগতের গোপন খবর সংগ্রহে অপরাধীদের মধ্য থেকেই সাধারণত এদের নিয়োগ করা হয়। কিন্তু রাজধানীর বনানী থানা এলাকায় এই সোর্সরাই এখন সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু কিছু পুলিশ কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযোগিতায় এবং আইনি আশ্রয়ের আড়ালে এরা নিজেরাই গড়ে তুলেছে মাদক ও জুয়ার বিশাল সিন্ডিকেট। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া এবং সোর্সদের ক্ষমতার দাপটে বনানী থানা এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনানী থানা এলাকার অপরাধ দমনের নামে ঘুরে বেড়ানো সোর্সদের বড় একটি অংশ পূর্বে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুলিশের সাথে গড়ে তোলে সখ্য। এই সখ্য ও পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে তারা ‘পুলিশের সোর্স’ বা ‘ফর্মা’ হিসেবে এলাকায় বাড়তি ক্ষমতার প্রভাব খাটানো শুরু করে। অনেক সময় দেখা যায়, আসামি ধরার নামে কথিত এই অপরাধী সোর্সরা পুলিশের গাড়িতেই ঘুরে বেড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায়।

 

বনানী থানা এলাকার কড়াইল গোডাউন বস্তি, কড়াইল স্যাটেলাইট এলাকা এবং সাততলা বস্তি এখন মাদক ও জুয়ার প্রধান আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন মূল হোতার নাম উঠে এসেছে:

 

ফর্মা সোহেল ও সিমা: সাততলা বস্তি এলাকার মাদক ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। সোহেল বনানী থানার সবচেয়ে প্রভাবশালী সোর্স হিসেবে পরিচিত। তার মাদক কারবারে কেউ বাধা দিলে তাকে ভুয়া ডিবি পরিচয়ে গ্রেপ্তার বা মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি নিজেদের ঘরে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপদে ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ ও বিয়ারের ব্যবসা পরিচালনা করছে এই চক্র।

 

গোডাউন বস্তির শহীদ: কড়াইল গোডাউন বস্তির মাদক ব্যবসার মূল মহাজন। রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে (আগে যুবলীগ করলেও বর্তমানে বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে) সে মাদক ব্যবসার পাশাপাশি গোডাউন বস্তির চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তার কথামতো দাবি পূরণ না হলে বা তার অপরাধের বিরোধিতা করলে সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

অন্যান্য সহযোগী: কড়াইল গোডাউন বস্তির সোর্স হারুন, ড্রাইভার কাশেম, কড়াইল স্যাটেলাইট এলাকার খোকা ফর্মা এবং সাততলা বস্তির বডু জাকির, পিচ্চি কবির ও আনোয়ার সরাসরি এই মাদক ও জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত।

 

অভিযোগ রয়েছে, বনানী থানার কিছু অসাধু এসআই (উপ-পরিদর্শক) ও এএসআই (সহকারী উপ-পরিদর্শক) এই সোর্সদের মাদক কারবার থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা চাঁদা পেয়ে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বনানী বা কড়াইল এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করলে, এই অসাধু কর্মকর্তারা অভিযানের পূর্বেই সোর্সদের সতর্ক করে দেন। ফলে অধিকাংশ অভিযানই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাততলা ও কড়াইল বস্তির একাধিক বাসিন্দা জানান, “সোর্সদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা বা সুবিধা না দিলে তারা যেকোনো সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারে। পুলিশের গাড়িতে তাদের ওঠাবসা দেখে আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। আমরা এই সোর্স-সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চাই।”

 

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য পাওয়ার জন্য অপরাধীদের সোর্স হিসেবে ব্যবহার করা বিশ্বজুড়েই একটি প্রচলিত মাধ্যম। তবে সোর্সদের ওপর পুলিশের কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা না থাকলে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করবে—এটাই স্বাভাবিক। পুলিশ যদি সোর্সদের অপরাধের অংশীদার বানিয়ে ফেলে, তবে তা গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে এবং আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।

 

এ বিষয়ে বনানী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, অপরাধী বা মাদক কারবারিদের সাথে পুলিশের কোনো আপস নেই। সোর্স পরিচয়ে কেউ যদি মাদক ব্যবসা বা জুয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তবে তার বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সোর্সদের মদদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

বনানী এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, অবিলম্বে এই কথিত সোর্সদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং কড়াইল ও সাততলা বস্তিকে মাদক ও জুয়ামুক্ত করতে সৎ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে চিরুনি অভিযান চালানো হোক।

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ জাহিদুর রহমান জাহিদ । বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ঢুলিভিটা, ধামরাই, ঢাকা

প্রিন্ট করুন